আজ ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ব বই দিবস নিয়ে দুটি কথা

মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু

 

বিশ্ব বই দিবসের ইতিহাস বহু পুরাতন সেই মানবের সৃষ্টি লগ্ন থেকেই। যখন প্রথম মানব আদম (আঃ) কে জগতে প্রেরণ করা হয় ঠিক তখন থেকেই। মহান রাব্বুল আলামীন তখন অহী প্রদান করতেন, কখনও লিখিত কখনও প্রস্তরখণ্ডে আবার কখনোবা গাছের ছাল-বাকলের আদলে। এমনও আছে প্রভু তাঁর বাণীগুলো নির্বাচিত যুগশ্রেষ্ঠ মহা মানবের অন্তরে সংরক্ষণ করে গেঁথে রাখতেন সময় সুযোগ বুঝে প্রচার প্রসারের জন্য। এভাবেই মহা মানব, মহা দার্শনিক, মহা বিজ্ঞানী বা মহা পণ্ডিত ব্যক্তিগণ (যাদেরকে অবতার বা নবী রাসুল বলা হয়ে থাকেন) যথা আদি মানব আদম (আঃ) থেকে শুরু করে নূহ (আঃ), দাউদ ও সোলাইমান (আঃ), ইব্রাহীম (আঃ), মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মদ (সাঃ) সহ অগণিত বার্তাবাহকগণ সত্য ও পবিত্র কিতাব তথা জীবন চলার পাথেয় বা সংবিধান অর্থাৎ মহামূল্যবান বই দিয়ে সমাজকে করেছেন সুন্দর থেকে আরও সুন্দর, জগৎ করেছেন আলোকিত ও ঝলকিত। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আমরা হয়েছি অজ্ঞ থেকে বিজ্ঞ। এখন আমরাও বই লেখি! বই পড়ি। বইয়ের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলি।

 

আধুনিক কালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ব বই দিবস বা বিশ্ব গ্রন্থ দিবস অথবা বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস বা বইয়ের আন্তর্জাতিক দিবস নামেও পরিচিতি লাভ করেছে কিন্তু জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো আদিকালের সেই ঐতিহাসিক ইতিহাস ঐতিহ্য বেমালুম ভুলে গেছেন।

 

বিশ্ব বই দিবসকে বলা হয়- বই পড়া, প্রকাশনা, সংকলন এবং আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বুক নাম্বার তথা কপিরাইট প্রচারের জন্য জাতিসংঘের শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ইউনেস্কো দ্বারা আয়োজিত ও প্রতিষ্ঠীত একটি বার্ষিক দিবস হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বিগত ২৩ শে এপ্রিল ১৯৯৫ ইং সালে ইউনেস্কো প্রথমবারের মত বিশ্ব বই দিবস উপযাপন করে। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর ২৩ শে এপ্রিল বিশ্ব বই দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে, ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও আমরাও পালন করে থাকি ও স্মরণ করে থাকি।

 

ইতিহাসে কারোর নাম স্বর্ণাক্ষরে থাক বা না থাক আমি ব্যক্তিগতভাবে জানা অজানা সেই সকল শিক্ষাগুরু মহাশয়দের সবসময়ই হৃদয়ের গভীর হতে স্মরণ করে থাকি।

 

চলুন জেনে নেই কিভাবে আসলো এই বিশ্ব বই দিবসের ধারণা। দিবসের মূল ধারণাটি আসে তৎকালীন জনপ্রিয় এক ভ্যালেন্সীয় লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেসের চিন্তাভাবনা থেকে। ওল্ড টেস্টামেন্ট এণ্ড নিউ টেস্টামেন্ট ও বাইবেলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হলেও সেই সময়ে তিনি তার ব্যক্তিগতভাবে প্রিয় লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেসকে শ্রদ্ধা বা সম্মান জানানোর জন্য একটি উপায় হিসাবে উক্ত ধারণাটি পেশ করেন যাহা আমার দৃষ্টিতে সর্বজনীন ছিল না।

 

বেশি দিন আগের কথা নয়, এই তো সেদিনের কথা! বিগত ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন মহারাজা মিস্টার আলফনসো ত্রয়োদশ স্পেন জুড়ে তাদের রচিত ও নিজস্ব স্পেনীয় বই দিবস পালনের জন্য একটি রাজকীয় ফরমান জারি করেন কারণ তাদের সেই আদি ইতিহাস ঐতিহ্য ছিল।

 

তখনকারদিনে বই মানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বই মানে একটি জীবন্ত ইতিহাস। বই মানে উচ্চস্তরের জ্ঞানভাণ্ডার, সেটা সাহিত্য হোক বা ইতিহাস অথবা ধর্মগ্রন্থ হোক। মানুষ মনোযোগ সহকারে পড়তেন ও সেই শিক্ষা প্রচার করতেন। এরপরে আস্তেধীরে সমগ্র স্পেনে দিবসটি পালন করা শুরু হয় ও প্রচলিত ছিল। উল্লেখ্য প্রথমে ৭ ই অক্টোবর সেই বিখ্যাত লেখক থের্ভান্তেসের জন্মদিনে বই দিবসটি পালন করা শুরু হয়, পরে তার মৃত্যুদিন অর্থাৎ ২৩ শে এপ্রিলে বই দিবস স্থানান্তর করা হয়। তখনও উক্ত দিবসকে কেন্দ্র করে নানান উৎসব ও বই মেলায় আয়োজন করা হতো রাষ্ট্রীয় ভাবে।

 

ধীরে ধীরে এই সংবাদ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ বিদেশে প্রচার হলে তারাও উক্ত দিবসটি পালন করেন ও আনন্দ বিনোদন করেন। চলতো জ্ঞানের চর্চা ও অনুশীলন এবং মাঝেমধ্যে পণ্ডিতদের সম্মেলনে জ্ঞানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হতো।

 

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যায় কিন্তু কথা রয়ে যায়। আমি তখন ঢাকায় থাকি। আমাদের ঘরে একটি সাদাকালো ১৪ ইঞ্চি টেলিভিশন ছিল সম্ভবতঃ ফিলিপস কোম্পানির, ইংরেজি সালটি ছিল ১৯৯৫, জাতিসংঘের সুপরিচিত ও সুবিখ্যাত অঙ্গসসংগঠন ইউনেস্কো সিদ্ধান্ত নেন যে, বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস উদযাপিত হবে ২৩ শে এপ্রিল।

 

সংবাদের অন্তরালে সংবাদ থাকে। কথার অন্তরালে কথা। পহেলা এপ্রিল ফুলের বেশ পরেই যেহেতু ২৩ শে এপ্রিল দিনটি সুবিখ্যাত ইংরেজ লেখক উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, পেরুভীয় ইনকা গার্তিলাসো দে লা ভেগা, এবং স্পেনীয় মিগেল দে থের্ভান্তেসসহ আরো বিশিষ্ট লেখকদের জীবনের সাথে সম্পর্কিত। কারোর জন্ম দিবস আবার কারোর মৃত্যুবার্ষিকীর দিন ছিল।

 

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়- আমি ইতিহাস পড়তে ভালোবাসতাম এখনও সময় সুযোগ হলেই ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করি, ইতিহাস পড়ি, বুঝার চেষ্টা করি। ঐতিহাসিক ঘটনাচক্রে প্রচলিত আছে বিশ্ববিখ্যাত লেখক উইলিয়াম শেক্সপীয়ার ও লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেস একই সময়ে বা একই তারিখে মৃত্যুবরণ করেন ২৩ এপ্রিল ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দ কিন্তু একই দিনে তারা মারা যাননি।

 

একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যেহেতু সেই সময় স্পেনে গ্রেগরীয় পঞ্জিকা ব্যবহার করা হত এবং ইংল্যান্ডে জুলীয় পঞ্জিকা ব্যবহার করা হত। গবেষণায় ও ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় ও দেখা যায় লেখক উইলিয়াম শেক্সপীয়ার প্রকৃতপক্ষে লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেসের মৃত্যুর ঠিক ১০ দিন পরে মারা যান এবং সে সময় গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় যা ৩ মে। যাই হোক পরে ২৩ শে এপ্রিল বিশ্বব্যাপী বিশ্ব বই দিবস পালন করা হয় এবং অদ্যাবধি পালন হয়ে আচ্ছে।

 

শিক্ষাগুরু গ্রীক লেখকরা বঞ্চিত হয়ে রইলেন। তবে আমি আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে মহা মণিষী থালেস, সক্রেটিস, প্লেটো এবং এরিস্টটলদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে স্মরণ করি।

 

কাতালোনিয়াঃ- যাই হোক লেখাটি শেষ করি! তৎকালীন প্রভাবশালী স্পেনের কাতালোনিয়াতে, সেন্ট জর্জ দিবস অর্থাৎ সুবিখ্যাত দিয়াদা দে সান্ত জর্দি, এই ঐতিহাসিক অঞ্চলের বিখ্যাত সন্ত অনুগ্রাহক ছিলেন ও এখনও আছেন মানুষের মণিকোঠায়।

বিগত ১৪৩৬ সাল থেকে পালিত হয়ে আচ্ছে বই দিবস বা বই মেলা। এবং এতে বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজন এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের মাঝে মূল্যবান উপহার বিনিময়ের প্রচলিত প্রথা আজও জড়িয়ে আছে এবং ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি কাজ করে।

 

শিল্পসাহিত্য প্রেমি কাতালোনিয়াতে সেন্ট জর্জ দিবসটি প্রিয়জনকে বই এবং গোলাপ প্রদানের মাধ্যমে শুরু ও উদযাপন করা হয় এবং এটি কাতালোনীয়দের তাদের অনুগ্রাহক সন্তদের প্রতি সম্মান এবং সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের একটি সুযোগ। তারা বিশ্বের জ্ঞান বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন বলে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

 

সুইডেনঃ- ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ সুইডেনে উক্ত দিনটি আঞ্চলিক ভাষায় (বার্ডসবোকড্যাগেন) Världsbokdagen অর্থাৎ বিশ্ব বই দিবস নামে অধিক পরিচিত। সাধারণভাবে বিশ্ব বই দিবস ২৩ শে এপ্রিল উদযাপন বা পালন করা হয় তবে উল্লেখ্য এটি খ্রিস্টানদের আনন্দ উৎসব ইস্টারের সাথে ঝামেলা বা সংঘর্ষ এড়াতে ইংরেজি ২০০০ ইং সালে এবং ইংরেজি ২০১১ ইং সালে উক্ত বিশেষ কারণ বশতঃ ২৩ শে এপ্রিল এর পরিবর্তে ১৩ ই এপ্রিলে পালন করা হয়েছিল।

 

যুক্তরাজ্যঃ- যুক্তরাজ্যে বিশ্ব বই দিবসটি পালন হয় মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত একটি দাতব্য অনুষ্ঠান হিসেবে যা বার্ষিকভাবে প্রথম বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত হয় ও এ দিবস উপলক্ষে বইয়ের বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ করা হয় ও প্রচার করা হয়। বই কেনাবেচা হয়। পাশাপাশি লেখকদের সম্মান ও তাঁদের কীর্তি সমূহ স্মরণ করা হয়ে থাকে।

 

আয়ারল্যান্ডঃ- আয়ারল্যান্ডেও উক্ত সম্পর্কিত দিবসটি যুক্তরাজ্যের মতোই বিশ্ব বই দিবস পালন করে থাকে ও সেদিন তারা আনন্দ-বিনোদন করে থাকে। ব্যতিক্রম বই মেলায় চলে আড্ডা পার্টি ও গানবাজনা।

 

এভাবে বিভিন্ন দেশে বিশ্ব বই দিবস পালন করা হয়। বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাগ্রত হয়। জ্ঞানের বিকাশ প্রকাশ ঘটে। এভাবেই মানুষ সভ্যসমাজের সভ্যতায় ভূমিকা রেখে চলেছে।

 

বাংলাদেশঃ- আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে বই দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে র‌্যালি, পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব বিষয়ক আলোচনা, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনষ্ঠিত হয়ে থাকে। আমার মনে আছে ৯০ দশকে বিপিএটিসি স্কুল পরবর্তীতে বিপিএটিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন এবং বিটিভিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতা হতো, যারা ভালো স্টুডেন্ট ছিলেন তাদের নিয়ে, আমার দূর্ভাগ্য কারণ আমি ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম না তাই বিটিভির উক্ত প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারি নাই ও সাভার উপজেলা অডিটোরিয়ামে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো এবং সেটায় আমি সহ আমরা অংশগ্রহণ করতাম তবে সে সময় সেই প্রতিযোগিতা ছিল অন্য নামে বিশ্ব বই দিবস ছিল না।

 

আমার মনে আছে আমি ১৯৯৫ সালে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম অর্থাৎ সম্পাদনা করতাম বড় একটা সাদা আর্ট পেপারে। সেখানে আমি সুন্দর করে বিভিন্নজনের লেখা লিখতাম এবং নিজের কবিতাও লিখে প্রকাশ করতাম। তখন আমার হাতের লেখা মোটামুটি সুন্দর ও ভালো ছিল। আমার মনে আছে সে সময় কবিতা চর্চা করতেন আমার অতীব প্রিয়জন মনিরুজ্জামান খান আজাদ। তার লেখাও স্থান পেয়েছে ও দেয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

আজ বিশ্ব বই দিবস তাই অতীতের সেই স্বর্ণালি কথাগুলো মনে পড়ে গেল তাই শেয়ার করলাম। মনে রাখবেন বইয়ের মই দিয়েই সফলতার শিখড়ে চড়তে হয়। বই আপনাকে আমাকে আত্মায় প্রশান্তি দেবে, জ্ঞান অর্জন হবে তাই আসুন আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ঘরে একটি করে লাইব্রেরী গড়ে তুলি ও বই প্রেমি হই। মানবিক মানুষ হই।

     এ বিভাগের আরো সংবাদ