আজ ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সংযোগস্থল সাভার অঞ্চল,গ্যাস ব্যবহার হয় কালিয়াকৈর অঞ্চলে, কালিয়াকৈরে সুকৌশলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ

 

ফজলুল হক,কালিয়াকৈর (গাজীপুর)প্রতিনিধি

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা
হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। তবে এ ক্ষেত্রে তারা কিছু অভিনব কৌশল নেওয়ায়
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে রয়েছে কিছু জটিলতা। তিতাস কর্তৃপক্ষ
জানায়, সংযোগের উৎসস্থল তিতাস চন্দ্রা জোনাল অফিসের কাছে হলেও এটি
মূলত সাভার জোনাল অফিসের আওতায় । এ কারণে চন্দ্রা কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান
চালাতে পারে না। আবার অনেক ব্যবহারকারীর বাসা কালিয়াকৈর থানায়। এ কারণে
লাইন বিচ্ছিন্নের জন্য আশুলিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি কালিয়াকৈরের
সহায়তা প্রয়োজন হয়। ফলে দুই থানা সমন্বয় করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা
কঠিন হয়ে পরে।
জনা গেছে, পোষাক শ্রমিক অধ্যুষিত মৌচাক,সফিপুর চান্দরা এবং কালিয়াকৈরের
সীমান্ত সংলগ্ন আশুলিয়ার বাড়ইপাড়া, কবিরপুর শিল্পাঞ্চলে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস।
শিল্পাঞ্চল হওয়ার ফলে এ অঞ্চলে একদিকে যেমন রয়েছে গ্যাসের চাহিদা অন্যদিকে রয়েছে
শ্রমিকদের গ্যাসে রান্নার চাহিদা। এই দুই চাহিদাকে পুঁজি করে গ্যাস জালিয়াত
চক্র গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকার রাখালিয়াচালা, মৌচাক, সরকার
মার্কেট, মৌচাক কামরাঙ্গীরচালা, মৌচাক আইচ মার্কেট, চান্দরা বোর্ডমিল,
বিশ^াস পাড়া, হাবিবপুর, বাড়ই পাড়া, হিজলতলী, জিয়ারউদ্দিনের টেক এবং আশুলিয়ার
কবিরপুর, তেলিবাজার, পাগলা বাজার, বাড়ইপাড়া, জুম্মাঘর এলাকায় দশ সহস্রাধিক
বাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।
এখনো এ অঞ্চলে জ্বলছে হাজার হাজার অবৈধ বার্নার। যার ফলে একদিকে যেমন বৈধ
গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী সাভার আঞ্চলিক অফিস
কতৃপক্ষ আশুলিয়ার কবিরপুর, তেলিবাজার, পাগলা বাজার, বাড়ইপাড়া, জুম্মাঘর এবং
কালিয়াকৈরের হাবিবপুর, চান্দরা হাজিবাড়ি, বড়ইছুটি চন্দ্রা স্পিনিং মিল এলাকা,
উলুসাড়া, হিজলহাটি,হরতকিতলা এবং ডাইনকিনি অঞ্চলের অবৈধ গ্যাস সংযোগ
বিচ্ছিন্ন করে। গ্যাস জালিয়াতচক্র বিচ্ছিন্ন করার পরপরই পুনরায় কবিরপুর,
তেলিবাজার, পাগলাবাজার, সোহাগীরটেকি, বাড়ইপাড়া, হাবিবপুর, উলুসাড়া এলাকায়
অবৈধ সংযোগ প্রদান করেছে।
অবৈধভাবে দেয়া এসব সংযোগে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের পাইপ। যার ফলে
প্রতিনিয়তই ঘটছে দূর্ঘটনা। এরপরও অবৈধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও বেশি ভাড়া ও

ভাড়াটিয়ার আশায় এসব লাইনেই গ্যাস সংযোগ নিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা। ঘন ঘন
সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান পরিচালনা করায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কোনঠাসা হলেও
করোনাকালীন সময়ে আবার ঘুরে দাড়িয়েছে তারা।
অবৈধ সংযোগে বিশেষ কৌশলঃ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন
কোম্পানি লিমিটেড সাভার অঞ্চলের বিতরণ লাইন গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত
বিস্তৃত। ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার বাড়ইপাড়া এলাকা গাজীপুরের কালিয়াকৈর
থানার সীমান্ত ঘেঁষা। অসাধু গ্যাস চোরাকারবারিরা আশুলিয়া থানা এলাকার
বাড়ইপাড়া এনার্জিপ্যাক কারখানার দক্ষিণপাশ থেকে বিতরণ লাইন তৈরি করে
কালিয়াকৈর থানার উলুসারা, হাবিবপুর, বিশ্বাসপাড়া এলাকায় সহস্রাধিক বাড়িতে
অবৈধ সংযোগ দিয়েছে। এভাবেই আশুলিয়ার থানার কবিরপুর এলাকা থেকে সংযোগ
নিয়ে কালিয়াকৈর থানার সোহাগীরটেকি, পাগলাবাজার, তেলিবাজার এলাকায় পাঁচ
শতাধিক বাড়িতে অবৈধ সংযোগ দিয়েছে অসাধু ঠিকাদারেরা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড সাভার
আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বলেন, আমরা
নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে সাভার আশুলিয়ায় অধিকাংশ অবৈধ সংযোগ
বিচ্ছিন্ন করেছিলাম। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে আবার চোরাকারবারিরা সক্রিয় হয়ে
ওঠে। আমাদের কর্মকান্ড বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে তারা আবার পূণঃসংযোগ দিয়েছে।
এসব সংযোগ আবার আমরা উচ্ছেদ করা শুরু করেছি। যারা এসব সংযোগ দিচ্ছে
তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা
দায়ের করা হবে।
বৈধ গ্রাহকেরা আছেন তীব্র গ্যাস সংকটেঃ দশ সহস্ধসঢ়;্রাধিক অবৈধ গ্যাস
লাইনের সংযোগ থাকায় বৈধ গ্রাহকদের বাসা বাড়ীতে দেখা দিয়েছে গ্যাসের তীব্র
সংকট। কালিয়াকৈর, সফিপুর, মৌচাক ও চান্দরা এলাকায় আবাসিক বাসাবাড়ীতে
সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নিয়মিত গ্যাস থাকছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে
স্থানীয় তিতাস গ্যাসের বৈধ কয়েকজন গ্রাহক জানান, আমাদের নির্ধারিত বৈধ
গ্যাস লাইনের জন্য গ্যাসের যে পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে সেই পাইপ থেকে অবৈধ
গ্যাস লাইনের সংযোগ দেয়া হয়েছে। সংযোগ দেয়ার সময় তিতাস গ্যাস অফিসে
জানালেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহন করে নাই। এ সব অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারনে
আমরা আমাদের বৈধ লাইনে সারাদিন গ্যাস পাই না। আর বাসায় গ্যাস না থাকার কারনে
অধিকাংশ সময় বাহিরের হোটেল থেকে খাবার কিনে এনে খেতে হয়।
সংযোগ বিচ্ছিন্নকরনঃ এবং পূণঃসংযোগের কাজ চলছে সমানতালেঃ
কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস
লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কয়েক দিন পরে গ্যাস জালিয়াত চক্র তিতাস গ্যাস
অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজসে পূনরায় আবার ওই সব
অবৈধ সংযোগ দিয়ে দিচ্ছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। উপজেলার বিশ^াস
পাড়া এলাকার জনৈক ব্যাক্তি জানান, গত সপ্তাহে হাবিবপুর এলাকায় বিচ্ছিন্নকৃত
প্রায় চার শতাধিক বাড়ীতে তৃতীয় বারের মত অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
গাজীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগের মূল হোতা কাপাসিয়ার পাবুর
এলাকার আসাদ মিয়া স্থানীয় দালাল চক্রের সহায়তায় এই সংযোগ দিয়েছে বলে
স্থানীয়রা জানায়।

মহাসড়ক ঘেঁষা বিতরণ লাইনে লিকেজঃ সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল
মহসড়কের পাশ দিয়ে স্থাপনকৃত উত্তরবঙ্গ অভিমুখি তিতাস গ্যাসের মূল সঞ্চালন পাইপে
কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর-মৌচাক এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহসড়কের ওপর বের
হচ্ছে গ্যাস। দেখার যেন কেও নেই, এর ফলে মারাত্নক ঝুঁকিতে রয়েছে যানবাহন
চালকসহ সাধারন পথচারী। এ ছাড়াও কালিয়াকৈর পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের
হরিনহাটিসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুরে অসংখ্য
লিকেজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন যাবত অনবরত গ্যাস বের হচ্ছে। গ্যাস পাইপ লাইনের লিকেজ
দিয়ে বিপুল পরিমানে গ্যাস বেরিয়ে যাচ্ছে অথচ উপজেলার কালিয়াকৈর ও সফিপুরসহ
বিভিন্ন স্থানে বৈধ গ্রাহকরা তাদের বাসাবাড়ীতে ঠিকমত গ্যাস পাচ্ছে না।
আদায় করা হচ্ছে মাসিক বিলঃ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালিয়াকৈর
উপজেলার সফিপুর এলাকার রাখালিয়াচালা, মৌচাক, সরকার মার্কেট, মৌচাক
কামরাঙ্গীরচালা, মৌচাক আইচ মার্কেট, চান্দরা বোর্ডমিল, বিশ^াস পাড়া,
হাবিবপুর, বাড়ই পাড়া, হিজলতলী, জিয়ারউদ্দিনের টেক এলাকায় প্রায় দশ সহস্ধসঢ়;্রাধিক
বাড়ীতে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার অবৈধ
গ্যাস ব্যবহারকারী কলোনীর মালিক এক মহিলা জানান, প্রতি মাসে বাড়ী প্রতি
তিতাস গ্যাস অফিসের কথা বলে গ্যাস বিলের নামে তিন শত টাকা করে আদায় করে
থাকে একটি চক্র। দেখা গেছে প্রত্যেক বাড়ীতে রাইজার না দিয়ে একটি রাইজার
থেকে একসাথে ১০ থেকে ১৫টি বাড়ীতে ৫০ থেকে ৬০টি চুলা জ¦ালানো হচ্ছে
অত্যান্ত ঝুঁকি পূর্নভাবে। এ সব অবৈধ গ্যাস লাইন থেকে যে কোন সময় ঘটে যেতে
পারে বড় ধরনের অগ্নিকান্ডের মত দূর্ঘটনা।
এ ছাড়াও সফিপুর, রতনপুর, মৌচাক এলাকায় বহুতল বাসাবাড়ীতে ৫টি চুলা ব্যবহারের
অনুমোদন থাকলেও অবৈধ ভাবে ব্যবহার করছেন ১০ থেকে ১৫টি চুলা। এ ভাবে অবৈধ
গ্যাস সংযোগ চলতে থাকলে সরকার যেমন লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে অপরদিকে
বাসাবাড়ীসহ কলকারখানা গুলোতে দেখা দিচ্ছে চরম গ্যাস সংকট। এই অবৈধ গ্যাস
সংযোগের সাথে তিতাস গ্যাস অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে
বলে জানান তারা। অনেকে আবার বলেছেন তিতাস গ্যাস অফিসে লিখিত অভিযোগ
করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
কালিয়াকৈর চান্দরা তিতাস গ্যাস বিতরন ও বিপনন কোম্পানি লিমিটেড চন্দ্রা
জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যাবস্থাপক মোহাম্মদ মামুনুর রহমান জানান,
কালিয়াকৈর উপজেলার ভিতরে যে কয়টি লিকেজের স্পট রয়েছে তা চিহিৃত করা হয়েছে
এবং মেরামতের জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। গ্যাস লাইনের এসব
লিকেজ দ্রুত মেরামত করা হবে। অবৈধ গ্যাস লাইন সম্পর্কে আমার বিস্তারিত জানা
নেই, তবে কোন অবৈধ গ্যাস সংযোগ থাকলে তা অভিযানের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হবে।

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap