আজ ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ডাক্তার পিটানোর সংস্কৃতি – একটি ভয়াবহ রোগ

সঞ্জয় সমদ্দার- লেখক: নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার:

আমাদের জীবনে ডক্টরদের ভূমিকা নতুন করে বলার কিছু নাই। একজন মানুষ পুরো একটি জীবন হয়তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী আছে যাদের কাছে একটি দিন না গিয়েও পার করে দিতে পারবে। কিন্তু জীবনে এক বারও ডাক্তারের কাছে যাবে না তা কী সম্ভব?! সাধারণ উত্তর হলো – না।

প্রত্যেকটা মানুষ জানি আমাদের জীবনে ডাক্তারদের প্রয়োজনীয়তা কতখানি। বিপদে পড়লেই আমরা ডাক্তারদের শরণাপন্ন হই। ডক্টরদের কোনো ডিউটি আওয়ার নাই, দিন নাই, রাত নাই চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকবেন টাইপ অবস্থা!

এই যে মহামারীতে অন্যান্য অনেক পেশাজীবীর মতো জমানো টাকা তারা খরচ করে বছরখানেক তো নিশ্চিন্তে কাটাতে পারতেন অনেক সিনিয়র ডক্টর। কিন্তু না নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে, পরিবারের সদস্যদের চুড়ান্ত দুশ্চিন্তায় রেখে অমানুষিক পরিশ্রমে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

নিজের জীবনের মায়া সবারই আছে। ডক্টররা বিপজ্জনকভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন কিন্তু সহকর্মীদের মৃত্যুতে পিছু না হঠেও সাহসিকতার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমার দেশের ডক্টররা।

কিন্তু বিনিময়ে কী পাচ্ছেন? এই যে রোগীর অনাকাঙ্খিত কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মাঝে মাঝেই ডাক্তারদের উপর হামলা করা, হামলা করে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে, কারণ কী? দীর্ঘদিনের মগজ ধোলাই ও মূল্যবোধের পতনের জন্য এই জঘন্য অপচর্চা চলছে..

এক্ষেত্রে রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ থাকে ডক্টরদের অবহেলায়। ধরে নিলাম ডক্টরের ভুল ছিলো। কোন্ পেশায় ভুল হয় না। কোন্ পেশায় একজনও খারাপ মানুষ নাই। খারাপ শিক্ষক, খারাপ পুলিশ, খারাপ ব্যবসায়ী যদি থাকতে পারে খারাপ ডাক্তার থাকতে পারে না? এখন হয়তো বলবেন, অন্য কারো ভুলে তো মানুষ মারা যায় না! আরে ভাই অন্য কেউ এরকম অসংখ্য জীবন বাঁচাতে উছিলাও হয় না।

জীবন-মৃত্যু নিয়ে যাদের প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয় তাদের এভাবে ক্যানো মার খেতে হবে অশিক্ষিত, পাতি নেতা, বর্বর মগজহীন লোকজন দ্বারা?

বিসিএস দিয়ে পাবলিক সার্ভিসে ঢুকলেও একজন উপজেলা স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডক্টর আমজনতার কাছ থেকে ঐ থানারই টিএনও বা ওসির তুলনায় খুব কম সম্মান পান। সমীহ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিভিন্ন কমিটির উপ-কমিটির পাতি নেতা, এলাকার আন্ডার মেট্রিক মেম্বার পর্যন্ত জাতির মেধাবী সন্তানদের সাথে যা তা ব্যবহার করে। অথচ এই নিম্ন শ্রেণির মূর্খরাই আবার থানায় গেলেই টানটান সোজা হয়ে যায়। টিএনও অফিসে গেলেও গলার আওয়াজ নিচু হয়ে যায়!

আমজনতার মাঝে এই বোধ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ডক্টরদের ক্ষমতা নাই। ডাক্তাররা নিরীহ, ডাক্তাররা অস্ত্র ছাড়াই অস্ত্রোপচার করেন!

অথচ এই যে বিভিন্ন ক্ষমতাবান, অস্ত্রধারী লোকজন রোগে পড়লেই ডক্টরদের কাছে যান। সেরে উঠলেই ভুলে যান। আমজনতার মতো এইসব ক্ষমতাবান পেশাজীবীরাও ডক্টরদের সেবাকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ ধরে নিয়েছেন। তাই তো কখোনো কখোনো ডক্টরদের উপর হামলার মামলা নিতে গড়িমসি দেখা যায় ।

শক্তের ভক্ত, নরমের যম এই মূর্খ জনগোষ্ঠির হাতে প্রতিনিয়ত জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে।

বর্বর অসভ্য মস্তিষ্ক কখনোই প্রকৃত মেধা, বিনয়, সেবা এগুলোকে শ্রদ্ধা করতে পারেনা। তারা এগুলোকে দুর্বলতা মনে করে। এই অসভ্যরা একমাত্র লাঠিকে ভয় পায়। বন্দুকের নলের সামনেই এই জানোয়াররা মানুষ হওয়ার ভান করে। আদতে এরা এক একটা হিংস্র জন্তু ।

ডক্টরদের সুরক্ষা দিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নাই। যেহেতু একশ্রেণির জনগণের মধ্যে ক্ষমতাভিতী ও প্রীতি আছে সেহেতু তাদের প্রসাশনিক ক্ষমতা দেয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। সর্বোপরি, ডক্টরদের ওপর কেউ হামলা করলে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ডক্টরদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মানব সেবায় নিবেদিত এই পেশার মানুষ যেনো আস্থার সংকটে না ভোগে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

যেকোনো পেশার প্রকৃত মেধাবী সুজনদের সম্মান করাটা যে অপরিহার্য সেই মূল্যবোধ আজ এবং আগামীর প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
    Share via
    Copy link
    Powered by Social Snap