বিএনপি’র প্রার্থী ঘোষণা

খুলনা-৬ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ঘোষণা: ভোটারদের অনাস্থা

বিশেষ প্রতিনিধি

খুলনা-৬ আসনে বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পি, যার বিরুদ্ধে রয়েছে নানান অভিযোগ। তিনি খুলনা-৪ আসনে একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ করে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন খুলনা-৬ আসনের। এ নিয়ে খুলনা-৬ আসনের সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে অসন্তুষ্টি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে খুলনা-৬ আসনের জনসাধারণের মাঝে। অভিযোগ আছে তিনি এক সময়কার সর্বহারা পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আর সেই সময়কার ত্রাসের অভিজ্ঞতা ও অর্জন এখন কাজে লাগাচ্ছেন বর্তমান নির্বাচনী মাঠে।

কয়রা–পাইকগাছা খুলনার অন্যতম অবহেলিত একটি জনপদ। বছরের পর বছর এখানে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। এরকম একটি অবহেলিত আসনে, অন্য আসনের এক সময়কার ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে করা হয়েছে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী। এতে সাধারণ জনগণের মনে শঙ্কা এবং প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের অবহেলিত এ আসনটি আবারও অবহেলিত থেকে যাবে কিনা ? অন্য আরেকটি আসনে জন্মস্থান হওয়ায়, কেউ কেউ আবার নমিনেশন পাওয়া এই প্রার্থীকে অতিথি পাখির সাথে তুলনা করছেন।

এই নেতা খুলনা ৪ আসনের রূপসা উপজেলার ২নং শ্রীফলতলা ইউনিয়নে ২০০৩ সালে এবং ২০০৮ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তার নিজ ইউনিয়ন তথা নিজ জন্মস্থান ও আসনের জনগণের সেবায় কাজ না করে, কেন চেয়ারম্যান থেকে অন্য আসনে হঠাৎ করে এমপি প্রার্থী হলেন। আর কোন যুক্তিতেই বা নমিনেশন পেলেন।

খুলনা -৬ আসনের অন্তর্গত এলাকার স্থানীয় বেশ কিছু মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকা সত্ত্বেও কেউ প্রার্থী না পাওয়ায়, বিষয়টি এখন খুলনা-৬ আসনের জনসাধারণের মাঝে সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং কৌতুহল সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ছিলেন খুলনা জেলা বিএনপির আহবায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, জেলা সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক এডভোকেট মোমরেজুল ইসলাম, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ডাইরেক্টর সিনিয়র সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী, পাইকগাছা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ডাঃ মোঃ আব্দুল মজিদ ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাবেক সহ সভাপতি এস এম রফিকুল ইসলাম রফিক। মাঝে মধ্যে বাসস চেয়ারম্যান আনোয়ার আলদীন কে এলাকায় কাজ করতে দেখা গিয়েছে। এত এত স্থানীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকা সত্ত্বেও, বাহির থেকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণীত বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
এছাড়াও মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তি এ আসনের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দর্দশা নিয়ে কাজ করবে, এমনটি বিশ্বাস করতে পারছেন না বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ। এতে অনেকেই মনে করছেন এই নেতা কে মনোনয়ন দেয়ায় খুলনা ৬ আসন থেকে বিএনপি দলগতভাবে ভোট হারাবেন।

২০১৮ সালের প্রহসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যিনি এমপি ছিলেন, তার বাড়িও খুলনার এই আসনের বাইরে—তেরখাদা উপজেলায় ছিল। এবারও একই কায়দায় আওয়ামী লীগ স্টাইলে আসুন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরে থেকে প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

ইতিমধ্যে মনিরুল হাসান বাপ্পি তার প্রচারণা শুরু করেছে, কিন্তু স্থানীয়দের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন বিভিন্ন স্থানে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এই এমপি প্রার্থীর লিফলেট নিয়ে তার সমর্থকরা গ্রামের একটি ক্যারাম বোর্ড খেলার দোকানে গেলে বাগবিতন্ডার সৃষ্টি হয়। সেখানে দেখা যায়, কিছু যুবকের কাছে লিফলেট দেয়ার সময় বাপ্পির সমর্থকদের বহিরাগত বলে আখ্যায়িত করছে তারা। এ সময়ে যুবকরা এই প্রার্থীর উপর অনস্থা প্রকাশ করলে বাপ্পির সমর্থকরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে বুঝাতে চেষ্টা করে।

খুলনা ৬ আসনের কয়রা এলাকার ৬০ ঊর্ধ্ব বয়সী রমিজ উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘কয়রায় খোসা রাইখে ফল খাইয়ে ফেলে ওরাই(অন্য জায়গা থেকে আসা নেতারা)। আমি অনেক দূর দূর থেকে হাইটে এসেছি দেইখেছি ৫ জন ১০ জন করে লোক বইসে বইসে আলাপ কোইরছে আর আক্ষেপ কোইরছে এই নির্বাচনের চাহিদে এখন আর নেই’ (নিজ এলাকার কেউ নমিনেশন না পাওয়ায়)। ‘আমাগর অনেকেই চায়েছিল যে এইবার আমরা বিএনপিতে ভোট দিবো। আর জামাতে আমরা ভোট দিব না, কিন্তু সব জামাতেই আগ্রহ কোইরতেছে আবার। আমাগের দেশের লোকরে যদি দিত তাইলে এক চান্সে আমরা ভোটখান দিতাম। তা এখন যেহেতু আমাগের দেশের লোকরে নমিনেশন দিলে না, তা আমরা আর কি কোইরবো’। ‘বাইরের মানুষরেক দিয়া কি কইরবো আর । তা এখন দেশের যে দাঁড়িয়েছে তায়েক ভোট দেই’।

ইতিমধ্যেই ৫ই আগস্টের পরে এই বিতর্কিত নেতা মনিরুল ইসলাম বাপ্পির ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি লুটপাট ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এলাকার সাধারণ জনগণ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের মত কর্মসূচি পালন করেছে। যা স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, ডিজিটাল প্লাটফর্ম সহ জাতীয় পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে প্রচার হয়েছে। বিশাল এই বিক্ষোভ সমাবেশের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে, হাজার হাজার নারী শিশু সহ সাধারণ এলাকাবাসী ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করছে। এ সময় রূপসা উপজেলার ২নং শ্রীফলতলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পীর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি করে স্লোগান দিতে দেখা যায় তাদের। জানা যায় এই ঘটনার পরে, মনিরুল হাসান বাপ্পিকে আহবায়ক করে খুলনার যে জেলা কমিটি দেয়া হয়েছিল তা বিলুপ্তি ঘোষণা করে বিএনপি।

খুলনার পাইকগাছার উদীয়মান যুবক রাজনীতিবিদ রাশেদ(৩০) বলেন, ‘দল থেকে সদ্য নমিনেশন পাওয়া মনিরুল হাসান বাপ্পি একজন উগ্র রাজনীতিবিদ, তিনি এক সময়ে সর্বহারা পার্টির সদস্য ছিলেন। দাদা তপন এবং রশীদ মালিথা সরবোহারা গ্রুপ এর অন্যতম সহযোগী ছিলেন। তার ভয়ে আমরা সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই মুখ খুলে বলতে পারছি না’। ‘আমরা চেয়েছি আমাদের আসনে বাড়ি আছে বা বসবাস করে এমন একজন নেতাকে বিএনপি থেকে নমিনেশন দেয়া হোক। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় অন্য আসনের বাসিন্দা মনিরুল হাসান বাপ্পীকে দেয়া হয়েছে নমিনেশন।
আমরা আরো আশ্চর্য হয়েছি যে, মনিরুল হাসান বাপ্পির চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ কর্মসূচি হওয়ার পরে, তাকে আহবায়ক করে খুলনা জেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল । কিন্তু নমিনেশন দেয়ার কয়েকদিন আগে তড়িঘড়ি করে তাকে আবার কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে। এরপর পরপরই তাকে নমিনেশন দেয়া হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি তার অবৈধ অর্থের বলেই এমনটা হয়েছে’।
‘আমরা একটি ভিডিওতে দেখেছি খুলনা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা তুহিন ভাইকে এই নেতা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার হুমকি‌ দিয়েছিলো। এবং জেলা যুবদল সভাপতি ইবাদুল হক রুবায়েত ভাইকেও প্রকাশ্য হুমকি প্রদান করেছিলেন তিনি’। ‘তাকে আসলে আমাদের আসনের জনগণ জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থকরা মন থেকে চায়না, ভয় থেকে তার বিরুদ্ধে কিছু বলতেও পারে না’। আমরা দেখেছি, ৫ ই আগস্ট এর আগে ১৯শে মে, খুলনা প্রেসক্লাবে মহানগর ও জেলা বিএনপির একটি কর্মসূচী ছিল। সে কর্মসূচিতে পুলিশের হামলায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কয়েকশ নেতা-কর্মী আহত হয়। চারিদিকে যখন টিশারশেল আর গুলি চলছে, তখন খুলনা জেলা বিএনপির আহবায়ক ও সদস্য সচিব মনিরুল হাসান বাপ্পি, প্রেসক্লাবে আটকে পড়া প্রধান অতিথি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আজুজল বারী হেলাল ভাই সহ নেতাকর্মীদের ফেলে, খুলনার ফেরীঘাট মোড়ে গিয়ে মনের সুখে ধূমাপানে ব্যাস্ত ছিলেন। সে সময়ে সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল খুলনাতে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিপদে রেখে তিনি বিড়ি ফুকছেন এবং খোশ গল্প করছেন’।
‘আমাদের খুলনা-৬ আসনের সাধারণ জনগণ বিএনপির নিবেদিত সাপোর্টার। কিন্তু আমাদের আসনের স্থানীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মনোনয়ন না পাওয়ায় এবং একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়ায়, আমরা এই নির্বাচনকে নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছি না এখন’। যদি দেশ নায়ক ও দলের মাননীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করেন এবং আমাদের এই আসনের স্থানীয় কাউকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো। এতে আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলিত এ আসনটি সামনে আশার আলো দেখবে’

     এ বিভাগের আরো সংবাদ