লেখক:রাফিয়া তাসনিম
প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৪-এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘পরিষেবার সুযোগ: বিপর্যয় ও জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য’। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষদের পাশে দাঁড়ানো।
মানুষের ভাবনা, অনুভূতি ও সামাজিক বন্ধনের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা। মানসিক অস্থিরতা ও রোগের প্রভাবে ভাষা ও যোগাযোগের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ব্যক্তির জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ ক্ষেত্রে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকদের ভূমিকা অপরিসীম।
বাংলাদেশে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি পেশাটি তুলনামূলক নতুন হলেও এর প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বাড়ছে। সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) এই সেবার পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান হলেও সরকারি ও বেসরকারি অনেক হাসপাতালে এখনো এই সেবা পাওয়া যায় না। আজগর আলী হাসপাতাল, বাংলাদেশ ইএনটি হাসপাতাল, এভার কেয়ার হাসপাতাল ও এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাষা, কণ্ঠ ও গলধঃকরণ সংক্রান্ত সমস্যার চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত অনেকেই কথাবার্তা বা যোগাযোগে অসুবিধা প্রকাশ করেন; যেমন ধীরগতি, অসংলগ্ন বাক্য বা স্বরের দুর্বলতা। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ৭০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ভাষা সংক্রান্ত সমস্যা থাকে। এই পরিস্থিতিতে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকরা রোগীর ভাষাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, যোগাযোগের আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন এবং সামাজিক মেলামেশায় দক্ষতা বৃদ্ধিতে চিকিৎসা প্রদান করেন।
বর্তমানে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সরকারি নীতি ও স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় এই পেশার অন্তর্ভুক্তি, সরকারি মেডিকেল কলেজ সমূহে ৫ বছর মেয়াদী এই বিষয়ে বিএসসি কোর্স সম্প্রসারণ, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ে মানসিক ও ভাষাগত সমস্যার প্রাথমিক স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু করা জরুরি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১৪ শতাংশ শিশু মানসিক সমস্যায় ভোগে। অনেকেই জানে না, মানসিক সমস্যার সঙ্গে ভাষা ও যোগাযোগের সম্পর্ক কতটা গভীর। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিকে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মনের মুক্তি অনেক সময় ভাষার মুক্তিতেই নিহিত। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকদের অবদান স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সেবা নিশ্চিত করা গেলে আমরা একটি মানবিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
ইন্টার্ন, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিভাগ,সিআরপি, সাভার, ঢাকা।