বিশেষ প্রতিনিধি | সাভার
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BLRI) সদ্য সমাপ্ত ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ’ প্রকল্প নিয়ে একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘একপাক্ষিক, অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির স্পষ্ট বক্তব্য, ১৩৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে উটপাখি কেনায় সরকারের খরচ হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা, যা মোট বাজেট বা বরাদ্দের মাত্র ০.০৩৭ শতাংশ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণার অংশ হিসেবেই নিয়ম মেনে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, কোনো অপচয় বা অনিয়ম হয়নি।
ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, জুলাই/২০১৯ থেকে জুন/২০২৬ পর্যন্ত মেয়াদে ১৩৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা প্রাক্কলিত বরাদ্দে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি পোল্ট্রি খাতে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি একটি পত্রিকায় উটপাখি গবেষণাকে মূল উপাদান বানিয়ে "অর্জন শূন্য" বলে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্যকে আড়াল করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
উটপাখি গবেষণা: আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ
বিএলআরআই জানায়, গবেষণার জন্য সংগৃহীত ২৫টি উটপাখির পুষ্টিগুণ, মাংসের বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এদের অভিযোজন ক্ষমতা যাচাই করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
• স্লোটারিং বা নমুনা সংগ্রহ: গবেষণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বয়সে (৩, ৬, ৯, ১২ ও ১৮ মাস) মাংসের মান পরীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নিয়মে এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকের স্বাস্থ্য সনদ নিয়ে মোট ৫ ধাপে ১৫টি উটপাখি স্লোটার (নমুনা সংগ্রহ) করা হয়। গবেষণাভিত্তিক প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানে এটি একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া।
• বর্তমান অবস্থা: অবশিষ্ট ১০টি উটপাখির মধ্যে ৩টি বর্তমানে শেডে গবেষণার কাজে জীবিত রয়েছে এবং ৭টি পায়ে গুরুতর আঘাতজনিত জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
• প্রজনন সংক্রান্ত তথ্য: উটপাখি সাধারণত ৪-৫ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। গবেষণাকালীন ৫টি ডিম পাওয়া গেলেও অনিষিক্ততার কারণে বাচ্চা ফোটানো সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের আসল চিত্র ও অভাবনীয় সাফল্য
উটপাখি নিয়ে অপপ্রচারের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পটির প্রধান অর্জনগুলো। প্রকল্প পরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট প্রাণিপুষ্টি বিজ্ঞানী ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার জানান, প্রকল্পটি কেবল একটি সরকারি কাজ ছিল না, এটি ছিল পোল্ট্রি খাতকে স্বনির্ভর করার একটি জাতীয় মিশন।
"আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল পোল্ট্রির উচ্চ উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন, দেশীয় জাতের সংরক্ষণ এবং পুষ্টির আধুনিকায়ন। আমরা এতে শতভাগ সফল হয়েছি।"
প্রকল্পের প্রধান সাফল্যসমূহ:
নতুন জাত ও সাশ্রয়ী ফিড: কম খরচে অধিক মাংস ও ডিম উৎপাদনে সক্ষম নতুন পোল্ট্রি স্ট্রেইন উদ্ভাবন এবং বিকল্প ফিড ফর্মুলা তৈরি। প্রান্তিক পর্যায়ে আঞ্চলিক কেন্দ্র: নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৭.৯২ একর জমিতে বিএলআরআই-এর একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপন, যার ফলে উত্তরাঞ্চলের খামারিরা সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন। বিশাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি: দেশজুড়ে ১৮টি ব্যাচে ৪ হাজার ২৫০ জনেরও বেশি খামারি ও নতুন উদ্যোক্তাকে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা ও বায়োসিকিউরিটির ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ। নিরাপদ খাদ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন এবং পোল্ট্রি বিষ্ঠা থেকে বায়োগ্যাস ও পরিবেশবান্ধব সার তৈরির কার্যকর মডেল উদ্ভাবন। উচ্চতর গবেষণা: প্রকল্পের অধীনে ১টি পিএইচডি ও ১টি মাস্টার্স থিসিসসহ দেশে-বিদেশে আরও ৪টি পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
ভিত্তিহীন প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
বিএলআরআই কর্তৃপক্ষের মতে, মোট গবেষণা বাজেটের (৭৪৫ লাখ টাকা) সামান্য অংশ দিয়ে পরিচালিত এই উদ্ভাবনী কাজকে বিকৃত করে পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা দুঃখজনক। প্রকৃত তথ্য ও বাস্তবতা উপেক্ষা করে প্রকাশিত এ ধরনের অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনস্টিটিউটটি।
প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত আধুনিক ল্যাব, শেড এবং আঞ্চলিক কেন্দ্রসমূহ এখন থেকে বিএলআরআই-এর নিয়মিত সম্পদ হিসেবে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখে যাবে।