প্রকৃতি প্রেমী কবি মুহাম্মদ শামসুল হকের কবিতা- “নই-নদী”।

নই-নদী

– মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু

হাঁটাহাঁটি পা-পা করে
যমীনের বুকে জমানো পলি গন্ধ 
চিড় ধরা মাটির ছন্দ হয়েছে বিলীন, 
বাল্যকালের কচুরিপানাগুলো
নরত্ব হারায়ে জোয়ারের আশায় 
প্রতীক্ষায় দিনগুনে ক্লান্ত হয়ে যায়। 
সেখানে আবার আমার মতো 
এক হতভাগার আগমনে ভাষাহীন সৃষ্টি,
দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে, 
না বলা কথাগুলো হতে পারে টক ঝাল মিষ্টি 
জলাঞ্জলীর কৃষ্টি। 
একটি নদীর তীরে প্রভাতের রবির কিরণ মেখে 
প্রখর রোদ্দুর পেরিয়ে গোধূলী লগ্নে দাড়িয়ে ছিলেম 
নদীর এক কূলে আমি 
আর অন্য কূলে আমার এক নদী। 
নদীনালা-খালবিল শুকায়ে যায় 
নদীর বেদনার রেক শুকায় না, 
আমিও তেমনি একজন। 
মাঝে মাঝে মনে হয় 
আমি নদ হয়ে যাই 
যদি তাকে পাই। 
আমি গঙ্গাকে বলেছিলেম অপেক্ষা করতে 
কিন্তু তাঁর রূপ প্ৰবাহিনীর মতোই 
বেলা শেষে আপগা আপগা করেই আমি ক্লান্ত 
নই তুই কই ?
কখনোবা জলপ্রবাহের তরঙ্গে 
মনে পড়ে বৃষ্টি ভেজা সেই দিনগুলোর কথা। 
“জলের পানে নদী চলে –
আমি চলি তীরে,
ঘর বাঁধা হবে কি না –
বিধাতাই জানে”। 
কতো যে ত্তঘের পালাবদল হলো 
তা ভুলে গেছি অনেক আগেই। 
বড়শি হাতে 
আমি খালেরপাড়ে বসে থাকি 
ভাগ্যহত ! প্রকৃতিও দেয় ফাঁকি, 
দুঃখ কোথায় রাখি ?
জলপ্রণালী আমার দুঃখে ক্রন্দন করে অবিরত। 
আমি ক্যানেলের কাছে যখন যাই 
জলস্রোতের গতি বেড়ে 
বন্যা হয়ে যায়। 
হঠাৎ বন্যার জলপ্লাবন 
আমার বুকে মহাপ্লাবনে ধেয়ে আসে। 
তবুও আমি দাঁড়িয়ে থাকি 
আমি নির্বোধ,
হারানো মিতাই যদি দেখা পাই। 
আমি নদীকে সমুদ্রের তীরে খুঁজেছি 
ধুয়াকুন্ডলীর বেশে থাকে ধরাছোঁয়ার বাহিরে 
ঐ দূর সীমানায় দেখি পুষ্করিণীকে 
ভাগীরথীর বাহিত বাতাস 
আমার দেহে এসে জাপটে ধরে 
হারিয়ে যাই নদীর বুকে 
কিন্তু তাতে কি প্রাণ জুড়ায় ?
তুষের আগুন হয়ে যায় তেলেবেগুন
ছটফট করে অঙ্গ তরঙ্গে ঝড় উঠে, 
অহেতুক ফল্গুধারা করে লাফালাফি 
আমি শীতল দহনে কাঁপি। 
“ধরণীর বুকে এতো জল
পিপাসার পানি নাহি,
ছলছল আঁখি কোন নিয়ে –
আমি করুন গীত গাহি”। 
দেহের ছায়াটিও বাকরুদ্ধ 
আমায় করে অবরুদ্ধ। 
কোথায় সলিল ?
কোথায় বারি ?
দেখে যাও –
রেখে যাও স্মৃতি –
প্রীতির আশ্রয়ে বেড়ে উঠে লতা 
লোকে বলে প্রীতিলতা।
একদা জলবৎ নীর শান্ত হয়ে যায়,
ক্ষণিক পরেই হয়তোবা বৃষ্টি হবে 
বর্ষণে বর্ষণে কৃষকের খেত হবে পরিপূর্ণ 
দেখা যাবে তারুণ্য। 
বাদল জলপান করিতে চায় 
আহর জলযোগ দেবে জলখাবার,
দেবতার নহর শরাব আল-তাহুরা 
তোমায় মনে পড়ে। 
আমার শোকে নদীগর্ভ তৈরী হয় 
আবার শুকিয়ে যায় নদী,
নাব্যতার বুকে মরুভূমির ছোঁয়া 
জনশূন্য বিজনপ্রদেশ। 
শুধু আমি আর আমি 
অনেক সময় মাঝি নৌকা বেয়ে
আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বেজে উঠে কণ্ঠসঙ্গীত
“নই-নদী তোর প্রহর গুনে 
শূন্যে বাঁধি ঘর –
যৌবন গেলো বৃদ্ধা হলো 
তরীর তরণী,
এ ভাঙ্গা ডিঙ্গায় – 
তুমি পার হবা নি”।।
তবুও ওপার থেকে কোনো 
শব্দ শোনা যায় না। 
আমার জন্যে প্রকৃতি 
সামাজিক আপ্লাব পরি-বিপ্লব ঘটায়। 
ওরা চায় আমার মুখে একটু হাসি ফুটুক 
নয়ানজুলির শিরে লাগুক রঙীলা মুকুট। 
বান হবে ঝুঁটি সেই ধমিল্ল খোঁপায় –
বাঁধিবে ফুল ও মুক্তার মালায়। 
বিগি বিগি রাতের তারা ঝলমল দীঘি। 
সরসী সরোবর তুমি পেলে বর –
আমি হলেম পর। 
“ওহে নই-নদী –
তোমায় পেলে জুড়াইতো 
নূহের সেই জুদি”।