নদী দখল ও জল দূষণঃ হুমকির মুখে বাংলাদেশ (পর্ব-৪)

লেখক ও কবি: মুহাম্মদ শামসুল হক বাবুঃ

ঢাকার আশেপাশের নদীর পানিতে বিষ। ব্যবহারের অনুপযুক্ত। যেমনঃ- চারশ’ বছরের প্রাচীন নগর ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।

১৬১০ সালের কোনো এক পূর্ণিমা রাতে বুড়িগঙ্গার তীরেই সামরিক নৌ-বহর ভিড়িয়ে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঘোষণা করেছিলেন, সোনারগাঁও নয়, এখানেই হবে বাংলার রাজধানী ঢাকা।

১৮০০ সালের গোড়ার দিকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক আবাসিক প্রতিনিধি জন টেইলর বুড়িগঙ্গার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, বর্ষাকালে যখন নদীটি পানিতে পরিপূর্ণ থাকে তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো।

সেই ইউরোপের ভেনিসখ্যাত বুড়িগঙ্গা কালের আবর্তনে সৌন্দর্য এখন শুধুই ইতিহাস।

এক সময় যে নদীকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল ঢাকার নগরায়ণ এখন সেই নগরায়ণই যেন ক্রমশ নিঃশেষ করছে বুড়িগঙ্গাকে।

স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমানে বুড়িগঙ্গা ভয়াবহ দূষণের শিকার। এর জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংস হয়ে গেছে।

নদী জল্লাদদের দ্বারা নদী দখল, কাঁচামালের বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, ট্যানারিবর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, ইটভাটা, পলিথিন ইত্যাদির কারণে বুড়িগঙ্গার সব অক্সিজেন প্রায় শেষ হয়ে এটি এখন সেপটিক ট্যাংক বা দূষিত বর্জ্যের আধারে পরিণত হয়েছে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পবর্জ্য।

নদীতে পড়া বর্জ্যের ৪০ শতাংশ ট্যানারি শিল্পের, ২০ শতাংশ অন্য শিল্পের। মোট ৬০ শতাংশ বর্জ্যই শিল্পখাতের।

এর বাইরে ১৫ শতাংশ কঠিন বর্জ্য, ১৫ শতাংশ অন্য ও ১০ শতাংশ নৌযান বর্জ্য। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন ঢাকা শহরের ৪ হাজার ৫০০ টন আবর্জনা ও ২২ হাজার লিটার বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য পড়ছে।

এছাড়া পলিথিন জমে নদীটির তলদেশে ১০-১২ ফুট ভরাট হয়ে গেছে।

এদিকে গাজীপুরের টঙ্গী শিল্প এলাকা তুরাগ নদীর পাড়ে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর মতো তুরাগ নদীও দূষণের শেষ মাত্রায় এসে পৌঁছেছে।

শত বছরের পুরনো নদী ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে দূষণের কবলে। শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য যেমন সোডিয়াম সালফার এমোনিয়া-সহ বিভিন্ন বিষাক্ত ক্যামিকেল নদীতে এসে পড়ছে আর নদীর পানি করে তুলছে বিষাক্ত ও ব্যবহার অযোগ্য।

সরেজমিন বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া এলাকা থেকে পোস্তগোলা এলাকা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পানি কুচকুচে কালো রঙের।

অনেককে নাকে-মুখে রুমাল চাপা দিয়ে নৌকা পারাপার হতে দেখা গেছে। জানা যায়, ২২৭টি সংযোগ খাল ছিল এই বুড়িগঙ্গায়।

এগুলো দখল হয়ে গেলে তার মধ্যে ১৭০টি খাল উদ্ধার করা গেছে। বাকিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

কারণ প্রভাবশালীরা এসব খাল দখলের সঙ্গে জড়িত আছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের নামেও দখল করা হয়েছে এসব খাল।

নদী গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক কাজী আবু সাইদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বর্জ্য, বিশেষ করে লৌহজাত দ্রব্যগুলো নদীর তলদেশে জমা হয়। এ উৎসগুলো বন্ধ করা গেলে বুড়িগঙ্গাকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিআইডব্লিউটিসি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীকে সম্পূর্ণরূপে দূষণমুক্ত করে নদীর ওপর দিয়ে প্রায় বিশটি সেতু চালু করার জন্য বিশ্বব্যাংক আড়াই হাজার কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে আর এ কাজের দায়িত্ব বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীকে দেয়া হয়েছে এবং একেএকে সব কয়টি নদীকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সেই উপলক্ষ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্হা স্বাধীন ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন ড.মুজিবুর রহমান হাওলাদার (সচিব)।

ইতিপূর্বে তিনি ভূমি মন্ত্রণালয় এর সচিব হিসাবে দয়িত্ব পালন করেন। মাঠ প্রশাসনে তার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কমিশনে সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন জনাব মো: আলাউদ্দিন।

তিনি দীর্ঘ দিন যাবত নদী ব্যবস্থাপনা ও নদী সংশ্লিষ্ট কর্মে দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ণ বোর্ড, ২০০৮ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সিইও হিসাবে খাল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ণ ও সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

আশা করা হচ্ছে বর্তমান কমিশন আগের চেয়ে অনেক ক্ষমতাশালী ও নদীবান্ধব।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন যে, এ দেশ ১৬ কোটি মানুষের। কালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

নদী হারিয়ে যাচ্ছে বলে এ দেশে নজরুল, সুকান্ত ও জসীম উদ্‌দীনের মতো কবি আর জন্মাবে না। আমাদের দেশকে বাঁচাতে হলে নদীকে বাঁচাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সবার সহযোগিতা নিয়ে দেশের দখলকৃত নদী উদ্ধার করা হচ্ছে। আগামী দিনে দেশের এক ইঞ্চি নদীও কেউ দখল করতে পারবে না।

Continue Reading

নদী দখল ও জল দূষণঃ হুমকির মুখে বাংলাদেশ (পর্ব-৩)