নদী দখল ও জল দূষণ : হুমকির মুখে বাংলাদেশ (পর্ব-১)

লেখক ও কবি: মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু –                                                                                                                                                                  গবেষণার আলোকে নদী দখল ও জল দূষণ : হুমকির মুখে বাংলাদেশ নিয়ে দু’একটি কথা বলতে গেলে একটু পেছনে যেতে হবে, জানতে হবে ইতিহাস, তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক। নদীকে সমার্থক শব্দে সাহিত্যের ভাষায় তটিনী ও তরঙ্গিনী বলে ডাকা হয়। কি অপূর্ব নাম, শুনলেই প্রাণ জুড়িয়ে যেত কিন্তু বিকর্ষণের দহনে জ্বলেপুড়ে আকর্ষণ উড়ে গেছে ছাইভস্ম হয়ে। গ্রামবাংলার যৌবনভরা নদীর দেহখানি হায়নাদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে মৃত প্রায় সেই মরা নদীর জল। বাংলাদেশের নদীগুলো মিষ্টি জলের প্রাকৃতিক জলধারা যা ঝর্ণাধারার মতো প্রবাহিত ও বহমান ছিলো কিন্তু আজ সেই নদীর বুকে উজান ভাটির জোয়ারের উথালপাথাল অথৈ জলের ঢেউ নেই, হয়ে গেছে জীর্ণশীর্ণ ও বর্জ্য-পয়ঃনিষ্কাশনের ডাস্টবিন, যাহা বড়ই দুর্ভাগ্য ও দুঃশ্চিন্তার বিষয় বটে। নদীকে তার গঠন প্রণালী অনুযায়ী শাখানদী, উপনদী, প্রধান নদী, নদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতো। তবে এখন আর সেই প্রেক্টিক্যাল ধারণা বাস্তবতার সাথে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না যেমন আগে ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ছোট নদীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো কিন্তু এখন ছোট নদী তো দূরের কথা বড় নদীকেও দিনের আলোতে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এম. মোরিসওয়ার মতে, নদী হল খাতের মধ‍্য দিয়ে প্রবাহিত জলধারা River is a canal flow বিশেষতঃ উঁচু ভূমি বা পাহাড় গিরিখাত থেকে সৃষ্ট ঝর্ণাধারা, বরফগলিত স্রোত কিংবা প্রাকৃতিক পরিবর্তন থেকে নদীর জন্ম হয়ে থাকে। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলরাশিতে এক ধরণের প্রচন্ড গতি সঞ্চারিত হয়। ছুটে আসা এই দ্রুত গতিসম্পন্ন জলস্রোত স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় নদী নামে পরিচিত পায়। নদী যখন পাহাড়ি এলাকায় প্রবাহিত হয় তখন তার যৌবনকাল। এ সময় নদী ব্যাপক খননকাজ চালায় এবং উৎপত্তিস্থল থেকে নুড়ি, বালি, পলি প্রভৃতি আহরণ করে অতি সহজে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। নদী এভাবেই আবহমানকাল ধরে পৃথিবীপৃষ্ঠকে ক্ষয় করে চলেছে। আবার অন্য প্রান্তে করে ভরাট। মনে পড়ে সেই বিখ্যাত গানের কথাটি, নদীর একুল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে এইতো নদীর খেলা। উৎস মুখ থেকে মোহানা অবধি নদীর এই কাজকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্গত বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক প্রধান দেশ। শাখা-প্রশাখা সহ প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং অধিকাংশ এলাকাই শত শত নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলি মাটি জমে তৈরি হয়েছিলো চর এরপর দখল। যেমন পদ্মা নদীর আশেপাশে মাওয়া, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, কেরানীগজ্ঞ, ধামরাই সহ অনেক জায়গা আগে ছিলো নদী গর্ভে এখন সেখানে দখল করে হয়েছে বসতবাড়ী। বিশেষ করে ধলেশ্বরী, তুরাগ ও বংশী নদীর এপারওপার মানুষ নামের দানবের দল খেয়ে ফেলেছে। দখলদারদের ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর যতসব কাহিনী। এরা এক সময় ছিলো সর্বহারা শ্রেণীর সম্প্রদায় ভুক্ত বেঁদেদের মতো যাযাবর। এদের ছিল না কোনো বাড়ী ঘর। সেই শতশত বছর আগের কথা। ব্রিটিশ আমলে সিএস এর মাধ্যমে অনেক নদীর গর্ভ থেকে সৃষ্টি হওয়া চর বৈধতা পায়, কমে যায় নদীর আয়তন কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে চলে দখলের মহাউৎসব। হায়রে মানুষ। তখন ওই নিঃস্ব নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদনদীর মধ্যে অনেকগুলো আকার এবং গুরুত্বে বিশাল ছিলো। বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে- ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” বাংলাদেশের নদীগুলোকে সংখ্যাবদ্ধ করেছেন এবং প্রতিটি নদীর একটি পরিচিতি নম্বর দিয়েছেন। পাউবো ‘র হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা বর্তমানে ৪০৫টি এর ভিতর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী (১০২টি), উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী (১১৫টি), উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী (৮৭টি), উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী (৬১টি), পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী (১৬টি) এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (২৪টি) নদীকে বিভাজন করা হয়েছে।