কবি শামসুল হক বাবুর নতুন কবিতা “জাদুময়ী চাঁদ”

– মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু

সদা জাগ্রত সুন্দরী চন্দ্রিমা দিবে কি পাড়ি
কি সুন্দর হাসছে ঐ চাঁদ মামা ডাকছে।
সূর্য ঠাকুর দিয়েছে নিমন্ত্রণ লিখেছে চিঠি,
তেরোটি বছর পর তোর রূপ দেখে মরি –
বাপের বাড়ী- তেরো কুড়ি মধুর হাঁড়ি।

কোথায় পৃথিবী-চাঁদ-সূর্য গ্রহ উপগ্রহ
ঘূর্ণায়মান জ্যামিতিক তন্ত্রের চন্দ্রনাথ,
চন্দ্র কলার আবর্তনে ঘটে বিবর্তন,
তেরোবসন্তের পর আকাশ রঙিন হয়ে যায়
ভূমিষ্টকাল একটি শুভ সংবাদ নিয়ে আসে,
তেরোবর্ষপূর্তি’র পূর্ণিমার রাতের উৎসব।
একদিকে জোয়ার অন্যদিকে ভাটা,
চাঁদের গায়েও একটি কলঙ্ক আছে
তবে সে কলঙ্কতিলক ছড়ায় আলোক
তোমাকে করেছে আরো অপরূপ,
তোর ঝলকে কৃষ্ণতিলকও লজ্জা পায় –
গর্বিত মনে আনন্দে হাবুডুবু খায়।
সাদা’র সাথে কৃষ্ণ সিধুরে দারুণ লাগছে
তাই দেখে কবি সাহিত্যিক হয়েছে পুলকিত।

বিচ্ছেদের মাঝেও তোমার তুলনা তুমিই
যে বিচ্ছেদে জগত হয় আলোকিত
আমি সেই বিচ্ছেদ বেদনা চাই নিত্যদিন।
তেরোটি বছর পর বসন্ত ফিরে আসে
অন্যদিনেও চন্দ্র ফুল হয়ে থাকে।
কাছে আসলেও মরি- ফাঁকে গেলেও মরি!
শত্রু মিত্র- কোমল ও কঠিন পাষাণ যেই হোক
সবাই তোর সুন্দরের পূজারী- হৃদয়ের আয়না
কি যে জাদু আছে তোর ভিতর বিধাতাই জানে।
তুমি বারোমাসি ভালোবাসার খেত,
যখন তুমি ওই দূর সীমান্তে গমন করো
ঠিক তখনি একটি আলোকবিন্দু দেখি
আলোকবর্তিকা আমাকে ঘিরে থাকে।

তোমায় দেখে মনে জাগে অনেক ইতিহাস,
তুমি সেই মৃত্যু কুসুম কর্পস ফ্লাওয়ার –
পনেরো ত্রিশ চল্লিশ বছর পর ফুটে ফুল।
তুমি তো অদ্ভূত ধরনের ফুল ইউটান পলুও
তিন হাজার বছর পর ফুটে সেই ফুল,
তুমি কি বুদ্ধের পুনর্জন্মের ইঙ্গিত বহন কর?
নয়তো তিন হাজার বছর পর ফোটা উদুম্বর।
সেদিন মনে পড়েছিলো নীলকুরিঞ্জি’কে
বারোটি বছর সাধনার পর কুরিঞ্জি ফুটে।
তুই নাগলোকের শিব কামান পুষ্প নাগলিঙ্গম
চৌদ্দবছর পর কামের নেশায় মত্ত রাগিণী ফুল।
চৌদ্দটি বছর পরপর দুই হাজার বছর আগকথা
পবিত্র বেথেলহেমে যিশু খ্রিস্টের জন্মের রাতে –
নগরীর প্রতিটি বাড়িতে নাইট কুইন ফুটেছিল।
তুই কি সেই বেথেলহেম ফুল সৌভাগ্যের প্রতীক?
দৃশ্যমান ঐ মহাকাশের সকল সৃষ্টির রানী !
বিধ্বস্ত চেরনোবিলের বুকেও আজ হাসি ফোটে।
তুমি আবার বাঁশঝাড়ের গণপুষ্পায়ণ বাঁশ ফুল
পঞ্চাশ বা শতবছর পর একটি সন্ধ্যাবিলাস,
তুমি বিরল ইতিহাস রূপকথার গল্পসম চাঁদ।

তৃতীয়বারের মতো আবার কামিনীর সাথে দেখা
নুরের বাতি জ্বেলে ক্ষণিকের তরে
তুমি দূরে চলে যাচ্ছো তো যাচ্ছোই,
যতই দূরে চলে যাও না কেন –
দেখা অদেখার সেই রূপ ও সৌন্দর্য
এখনো আগের মতোই বলবৎ আছে চলমান।
যতই দেখি ততই ভালো লাগে- আমি মুগ্ধ,
তোর সৌন্দর্য ও গুন লিখে শেষ করা যাবে না
আমি যখন লেখা শুরু করি তোমায় নিয়ে –
তখন শেষ হতে চায় না কোনো লেখাই,
অতৃপ্ত আত্মায় ও কপালের ভাজে থাকি চিন্তিত
কাগজ শেষ হয়ে যায়- ভাবনার শেষ কোথায়?
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হতে থাকে –
গভীর হতে থাকে তোমার আমার প্রেম
আমার না বলা কথার বর্ণমালাগুলো
তোমার সাথে দুষ্টামী করে অবিরত।

অবিরাম মধুর ভালোবাসায় সিক্ত হই
জোছনা হারানোর ভয় জাগে নিত্যদিন।
ঘরের শত্রু বিভীষণ আমাবস্যার রাত –
তোমার জীবনের একটিমাত্র কালরাত,
একাত্তরে ধর্ষিতারা যেমন করে আর্তনাদ।
তুমি আবার চলে যাবে দূরে ওই বহু দূরে
পূনরায় কাছে আসবে অতীব নিকটে –
তীর ধনুকের ন্যায় দুই চোখের পলক।
তুমি কাছে এলেই ভুলে যাই সব কিছু
তখন শূন্যতার মূল্য বুঝা বড় দায় !
কথায় আছে মক্কার মানুষ হজ্ব পায় না,
সহেলি গো মনপ্রাণ সহে না কি কহিলি !
যখন এই সুন্দর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে
ঠিক তখনি কেউবা তোমায় নিয়ে ভাববে –
সে ভাবনার গল্প কবিতা গানে তুমি চির অমর
দুই নয়নে তোমায় যে দেখেছে সে মরেছে –
আর যে দেখেনি সে আফসোস করে মরে।

তোমার কদর অনেক- হে পরম জন্মান্তরবাদ
যখনই দূরে চলে যাও তখনি উপলব্ধি করি
তুমি ছাড়া আমার এ ঘর শূন্য মরুভূমি,
জনমানবহীন বিরান ভূমির মরু প্রান্তর।
তুমি পথহারা পথিকের আলোর দিশারি,
তুই কখনো চাঁদ মামা কখনো পূর্ণিমা’র চাঁদ,
বহুরূপী বর্ণচোরা নর ও নারী’র উভয় লিঙ্গ –
আমার দেহের আট কুঠরী নয় দরজার অঙ্গ।
মনে হয় তুমি কখনোবা ক্ষুদ্রতম শশী –
আবার কখনো সুবিশাল ভালোবাসায় পূর্ণ
একাদশীর শেষ প্রহরের মাহেন্দ্রক্ষণ।
পূর্ণিমার ভিতর রজনীর লুকায়িত প্রেম
সীমাহীন নিশি’র মাঝে যখন থাকো তুমি
শিশিরে সিক্ত হয়ে দূর হয় সকল হাহাকার।

সদা জাগ্রত সুন্দরী চন্দ্রিমা দিবে কি পাড়ি
কি সুন্দর হাসছে ঐ চাঁদ মামা ডাকছে।
সূর্য ঠাকুর দিয়েছে নিমন্ত্রণ লিখেছে চিঠি,
তেরোটি বছর পর তোর রূপ দেখে মরি –
বাপের বাড়ী- তেরো কুড়ি মধুর হাঁড়ি।

বিদ্র : চাঁদ’কে নিয়ে কবিতাটি লেখার রচনাকাল ১৪ সেপ্টেম্বর শনিবার ২০১৯ ইং, প্রকাশ কাল ১৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ২০১৯ ইং ধামরাই ঢাকা