ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ ইতিহাস

মুহাম্মদ শামসুল হক বাবুঃ-                                                                                                                                                                                                       

প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম ঘূর্ণিঝড় “ফনি” নামটি দিয়েছে খোদ বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই ফনি ঘূর্ণিঝড়ের অর্থ সাপ বা ফণা তুলতে পারে এমন প্রাণীর মতো দেখতে ও ভয়ঙ্কর। উদাহরণস্বরূপ- কিছু বিষধর সাপ (কেউটে) মাথা উচু করে তুলে ও গলার কাছের পাঁজর চওড়া করে ভয়াবহ চেহারা বানিয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দে নিশ্বাস ছাড়ে ও ছোবল মারার ভান করে অন্য প্রাণীদের ভয় দেখায়। এই মাথা উঁচু ভঙ্গীর সঙ্গে সাপের স্ফীতগ্রীবাকে ফণা বলে। আসল কেউটে ছাড়াও আরো কিছু সাপ যেমন শঙ্খচূড়ের ইংরেজী নামের মধ্যে (The King Cobra) থাকলেও শঙ্খচূড় এক প্রজাতির নয়। কিন্তু শঙ্খচূড়েরা বুক চিতিয়ে ফণার মত করে তবে একটু বেশী লম্বা আকার ধারণ করার সামর্থ আছে তাদের। তেমনি সুবিশাল ভয়ংকর ঝড় এই ফনি, যেমন- ফণা হল সাপের চওড়া করা বুক। এদের পাঁজড়ের খাঁচার সামনের দিক খোলা (স্টার্নাম নেই) সেই পাঁজড় ছড়িয়ে ধরলে ফণা তৈরি হয়। আর তখন এরা মাথা জমি থেকে অনেকটা তুলে ধরে নিজের থেকে বড় ও ভয়াবহ দৃশ্য তৈরী করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে বয়ে যাওয়া ঝড়ের নামকরণের ইতিহাসে ইহাকে ইংরেজিতে (Fani) লেখা হলেও এর বাংলা উচ্চারণ “ফণী”। এক সময় পৃথিবীর সৃষ্ট ঝড়গুলোকে হরেক রকম সাংকেতিক নম্বর দিয়ে শনাক্ত করা হতো, যাহা চলমান একটি প্রক্রিয়া তাইতো ২০০৪ সাল থেকে এশিয়া মহাদেশের বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোয় ঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। সে সময় ৮টি দেশ মিলে মোট ৬৪টি নাম বৈঠকে প্রস্তাব করেন। সেসব ঝড়ের নামের মধ্যে এখন “ফনি” ঝড়কে বাদ দিলে আরো ৭টি নাম বাকি রয়েছে। “বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা”র আঞ্চলিক কমিটি একেকটি ঝড়ের নামকরণ করে থাকে। যেমন বলা চলে- ভারত মহাসাগরের ঝড়গুলোর নামকরণ করে এই সংস্থার ৮টি দেশ যথা- ভারত, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান এবং ওমান। যাদের প্যানেলকে বলা হয় WMO / ESCAP এর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে ঝড়ের নামকরণ করা হত। ভারত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়কে “সাইক্লোন” বলা হলেও আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় “হারিকেন”, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বলা হয় “টাইফুন”। আঞ্চলিক এই ৮টি দেশ একেকবারে ৮টি করে ঝড়ের নাম প্রস্তাব করেছে। ৮ গুন ৮ প্রথম দফায় মোট ৬৪টি নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ফনির পরের ঝড়ের নাম হবে ভারতের প্রস্তাব অনুযায়ী “ভায়ু”। তারপরে আরও ৬টি ঝড়ের জন্য এখনও নাম তালিকায় রয়েছে। সেগুলো হলো হিক্কা, কায়ার, মাহা, বুলবুল, পাউয়ান এবং আম্ফান। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে এক বা একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অংশ নিয়ে থাকেন। আগে থেকে তারা আলোচনা করে নেন যে, কী নাম হবে। ঝড়ের নাম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য রাখা হয়, যাতে সেটি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা সামাজিকভাবে কোনো রকম বিতর্ক বা ক্ষোভ তৈরি না করে। উদাহরণস্বরূপ- ২০১৩ সালে একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া হয়েছিল “মহাসেন”। নামটি প্রস্তাব করেছিল শ্রীলঙ্কাই কিন্তু সেই দেশের সাবেক একজন রাজার নাম ছিল “মহাসেন”, যিনি ওই দ্বীপে সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছিলেন। ফলে এ নিয়ে জনগণের মাঝে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমে সেটিকে “নামহীন ঝড়” বলে বর্ণনা করে নিউজ করেন। পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কান সরকারী রেকর্ডপত্রে ঝড়টির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয় “ভিয়ারু”। প্রসঙ্গত বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ এক সপ্তাহ আগে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগটির নাম “ফনি”। সুবিশাল আকারের এই ঝড়ের আশঙ্কায় ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে সময় পার করছে। মানুষের নামকরণকৃত ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্কে আজ মানুষ দিশেহারা, তবে মনে রাখতে হবে নাম না দিলেও ঝড় একটি চক্রাকার প্রাকৃতিক ঘূর্ণিঝড়, যাহা যথা সময়ে সৃষ্টি হয়ে আঘাত হানবে এটাই নিয়ম।