কবিতা – “শরতের রাণী”

মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু

আমি যদি কবি সাহিত্যিক হতেম –
কথামালায় বরণমাল্য করে দিতেম।
আজ কবিতা’র পল্লীতে মল্লিকার আসর,
ষড়ঋতুর শরতকালের গল্প কবিতাগুচ্ছ –
দোয়েল শালিকের সুরেলা কণ্ঠের গান নহে তুচ্ছ।

শরৎকালের ছবি দেখে যাও
যাহা এখনো শেষ করতে পারি নি,
ওহে তুমি কি সেই শরৎচন্দ্র
একটি সুমিষ্ট শরৎসকাল
ভুবনমোহিনী মায়ার বাঁধন
কোথা হতে এলে মানবের ধরাতলে
চক্রাকার ঋতুবদলের পালাবদলে
একটি ভিনদেশী স্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায়
অপূর্ব শুভ্রতার শান্তির প্রতীক
কল্পনার বাসর ঘরে শরৎ আসে আর যায়
তুমি নির্মল উজ্জ্বল আলোতে শরতের রাণী।
আমি কাশফুলের কথা বলছি
একটি জীবন্ত কবিতার কথা বলছি
যে কবিতায় সাধু চলিত সংমিশ্রণ ঘটে
যেখানে ব্যাকরণ অকারণেই হাসে।

হঠাৎ প্রবল বর্ষা করে অশ্রুপাত
অঝোরধারায় সিক্ত- ঠোঁট ফাটা জমিন
শরতের সতেজ মাটি হয়ে যায় খাঁটি।
একটু একটু করে সূর্যের আলোয়
বৃক্ষরাজি খুঁজে পায় ঝলমলে দিবস
কোঁকড়ানো ঝাঁঝালো রোদ্দুর
আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি,
ষোড়শী’র অফুরন্ত রূপ-যৌবন
অব্যক্ত রেশমি ভালোবাসা।
তোমার রাজ্যে যখন প্রবেশ করি
দিক হারিয়ে সময় ভুলে যাই।
গ্রামীণ মঠোপথের দুবলা ঘাসে
জমে থাকা হাল্কা শিশিরের আলপনা জাগে প্রাণে
সেই আলপনা মাড়িয়ে আমি থাকি দাঁড়িয়ে
বহমান আনন্দ চিত্ত করে নৃত্য অবিরত।

হঠাৎ একটি শব্দ কর্ণকুহরে বেজে ওঠে
ডেকেছে শরতের শান্ত প্রকৃতি
অলস দুপুরের চঞ্চলা নৃত্য শিল্পী
কন্যাকুমারী সুনয়না তুমি অনন্যা,
প্রতিক্ষার সময় গড়িয়ে যায়?
তোমার পানে তাকালে চোখ ফেরানো দায়।
আকাশ পানে চেয়ে দেখি
গাঢ় নীল আকাশটি যেন
সাদা সাদা মেঘে ছেয়ে আছে।
চমকে উঠে দু পাপড়ির পলক –
অকস্মাৎ দেখি রঙধনুর ঝলক,
সাতরং ধারণ করে মহাকাব্যের প্রতিটি পাতা
সপ্তর্ষিমণ্ডলে সপ্তাশ্চর্য সপ্তপদ –
বধ করেছে বেঁধেছে বাসা,
চারিদিকে সফেদি কণিকা ভেসে বেড়ায়।

তুমি শুভ্রতার প্রতীক ফুল –
লুকানো প্রাণের দুল।
নাবালিকার ভূষণ তুমি উড়ন্ত কেশ
রমনীর উড়ন্ত শাড়ীর আঁচল,
তুমি স্বাধীনতা ও অমর একুশের গান।
ঐ নিকট আকাশে মেঘের দল
ভেঙে গিয়ে উঁকি দিয়ে যায়
জোড়া ঠাকুরের নীল সাদা’র সংমিশ্রণ।
শরতের এই শুভ্র মেঘের দৃশ্যপট
নরম ও গরম নীলাকাশ
আবার এসেছে বাংলায় ফিরে,
মিষ্টি ও প্রখরতার ছায়ায় –
ঘর্মাক্ত হই তোমার মায়ায়,
নিশাচর প্রাণী গড়েছে আস্তানা
ছনের ঘনবনের ভিতর প্রভাতীর রটনা।

ওই দেখা যাচ্ছে একদল অতিথি,
হেলিয়ে দুলিয়ে নৃত্যের তালে তালে
আগন্তুককে বরণ করে নেয়,
তখন আমি বাতাসে মিলেমিশে একাকার।
যখন পরখ করলাম একটি নদীকে
তখন তার বুকে চলছে করুণ দুঃখ
ভাটায় ভাটায় কাটায় জীবন,
হঠাৎ জোয়ার এসে নদীকে পূর্ণ করে দেয়,
ফিরে পায় হারানো ছন্দ হারানো সুখ !
এটা সম্ভব হয়েছে তোমার কারণেই।
তোমায় দেখে নদীও উঁকিঝুঁকি মারে
নদের বুকে উড়ন্ত কাশফুল ভেসে বেড়ায়
ভেসে বেড়ায় বাঁকেবাঁকে,
এক ঘর থেকে আরেক ঘরে
চলন্ত পাখির পালকের মতোই।

তখন কতোই না অদ্ভুত লাগে
আমি যখন কাশবনে যাই
তখন আমার গতরে জড়িয়ে থাকে
জড়িয়ে ধরে নিত্যনতুন বুকের পাঁজর
শতশত দূরন্ত চুম্বন উড়িউড়ি করে
লুটায়ে পড়ে ওষ্ঠ ও হাত পায়ে,
আমি উষ্ণ অভ্যর্থনা অনুভব করি।
খণ্ডিত চরেও ফুঁটেছে ফুল
তুলতুলে নরম কোমল হাসি
রাখালিয়া সুরে পবন বাদ্য-বাজায়
গগনের দর্পণে প্রাপ্তির খৈ –
চতুর দিকে সীমাহীন হৈচৈ।
কাশফুলের স্বর্গীয় আবেশ।
শিমুল তুলার ন্যায় প্রেমের পরশ দিয়ে
একটি বালিশ বানাতে চাই
বালিশটি হবে প্রিয়তমা’র উপহার।

কাশফুলের ঘর একটি আশীর্বাদ একটি বর।
কোথায় গেলি রে এদিকে আয়
একটি ছোট্ট বর নিয়ে যাও।
আমি কাশবনের ছন দিয়ে
একটি ছনের ঘর বানাতে চাই
এখানে নববধূবেশে রাত্রীযাপন করবে সে,
প্রকৃতি মানবের বসবাস
অন্নতার মাঝে পূর্ণতা –
দারুণ লাগবে সেই ভিন্নতা।
পথ হারিয়ে অবিরাম ছুঁয়ে চলে মন
এ আমার বাংলার অপরূপ জৌলুশ।
একটি শরৎবিকেল একটি গোধুলী
নদীতীরে বাতাসে ঢেউ খেলে
জনপ্রিয় কাশের সারি সারি ফুল
ছুঁয়েছে দুরন্ত শিশুর মায়াবী হাসি।

আদর সোহাগে ভরপুর –
নবজাতক তিনমাসি শিশু সন্তান।
ওই দেখা যাচ্ছে কাশবন –
বাবুই পাখির উড়াউড়ি,
মুনিয়া পাখির লুকোচুরি খেলা
চড়ুই পাখি ও টুনটুনির আনাগোনা
এতো সুন্দর পরিবেশ এতো কাশময় কেশ –
কানাবগির মতো দাঁড়িয়ে আহা লাগছে বেশ।
অজান্তেই হৃদয়ে তরঙ্গ প্রবাহে ঢেউ খেলে
দু’চোখ ভরে দেখে নিচ্ছে প্রকৃতি প্রেমীরা
অবহেলিত ঘাসের ফুল দিয়ে জয় করে মন।
মোনালিসাময় চিত্রকর্মের চেয়েও তুমি উর্ধ্বে
উর্ধ্বে তোমার অবস্থান ঘুমন্ত পরিস্থান।
আকর্ষণীয় হাসি আমি কাশি’র বলছি
কাশিদা’র ওই সংগীতের কথা বলছি
রাগহীন রাগীনির গ্রাম্য অনুরাগ !

আমাকে শেখায় কোমলতা ও সরলতা
উদারতা আর নির্মল ভালোবাসা
দিয়েছে পরম ও চরম স্বাধীনতা।
গুল্ম ফুলের এতো কদর জগতে অদ্বিতীয়
মানুষের মন জয় করে নেওয়ার যাদু
আহ সে কি লেখে বলে শেষ করা যায়।
তোমায় দেখে অ লেখকও হয়ে যায় লেখক
বাক্ প্রতিবন্ধীও শব্দ করে
বর্ণমালা নিয়ে খেলা করে বয়ে যায় বেলা।
পাষাণ পাষাণীর হৃদয় বরফের মতোই গলে
পাথরের বুকেও ফোঁটে ফুল,
দুর্ধর্ষ চোর ডাকাত ঘুমন্ত নজিবুল্লাহ
যার হাতে বন্দুক নামক অস্ত্র থাকে
সেই অস্ত্রও হয়ে যায় একটি মহা কলম
সৈনিকের পোশাক খুলে হয়েছে শব্দ সৈনিক।

আমি যদি রাষ্ট্র নায়ক হতেম
কাশবনকে দেশের সীমান্তে পাঠিয়ে দিতেম
তাই দেখে বহিঃশত্রুও প্রেমে পড়ে যেতো
ভুলে যেতো দখলতা ও শত্রুতা
নহে হিংসা বিদ্বেষ ক্রোধ উদিত হবে বোধ
জনতার শান্তির জন্যে দন্ডায়মান ষোল আনা প্রহরী
তোমার জাদু দিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করে দিবো।
আমি যদি রাষ্ট্র নায়ক হতেম
তাহলে তোমাকে প্রতিটি দপ্তরে –
বাংলার প্রতিটি ঘরে ও প্রতিটি জাদুঘরে,
ঐ পাবনার মানসিক চিকিৎসালয়ে
জেলখানার ভিতরে- চারদেয়ালের মাঝে
বিনোদন কেন্দ্রের পার্কে পার্কে
শহরের রাস্তায় অলিতে বা গলিতে
সাজিয়ে রাখার হুকুম দিতেম –
আমি যদি রাষ্ট্র নায়ক হতেম।

আজ্ঞে সে যাই হোক মশাই –
ভুবন চিলের ডানাগুলো হতভম্ব নির্বাক
সবুজ ঘাসের ওপর নুয়ে পড়া কাশবন
পথিককে হাতছানি দিয়ে ডাকে
শরতের উদ্ভিদরাজ্যে নীলের নীলিমা কম
শুধুই ধবধবে শুভ্রতার গোডাউন
মাঝখানে অভাব ঘোচাতে –
নীলাকাশের আগমন।
তোমাকে প্রথম দেখেছি নদীর পাড়ে
দ্বিতীয়ত দেখেছি পলিমাটি ঘেরা চরাঞ্চলে