একটি মানবতার গল্প ! কুরআনকে বিনিময় নিয়ে চিকিৎসা।

বাংলাপেপার ডেক্সঃ

একটি মানবতার গল্প ! কুরআনকে বিনিময় নিয়ে চিকিৎসা।

    যখন কিনা সমাজের হাসপাতাল ও ডাক্তারী পেশাকে ব্যাবসায় নামিয়ে এনে এমন পরর্যায়ে আনা হয়েছে যে ডাক্তারদের উপাধী হয়েছে কসাই আর হাসপাতাল গুলো কসাইখানা । নিউজ গুলোতে হর হামেসাই শুনতে বা দেখতে পাওয়া যায় যে অভাবি রুগীটা টাকাওয়ালাদের চিকিৎসা দেয়া ওই ডাক্তারের ধার্য করা ফি বা কোটিপতিদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হাসপাতালের ধার্যকৃত টাকা না দিতে পেরে, চিকিৎসার অভাবে গরিব রুগীর মৃত্যু, বা দরীদ্র গর্ভবতি মায়ের মৃত্যু, অথবা এক দুই মাস নবজাতক সহ মাকে হাসপাতালে আটকে রাখার ঘটনা। ডাক্তার ও চিকিৎসা এখন আর সেবা নামে আখ্যাইত হয় না, দুএকটা যাও সেবা করার নামে সেবা দিচ্ছে তাও আবার সকল সেবা মিলছেনা সেখানে, বাধ্য হয়েই যেতে হচ্ছে সেই বড় অংকের ডাক্তার আর হাসপাতালে।

বাংলাদেশের মত একটি দেশে চিকিৎসার অবস্তা হওয়ার কথা ছিলো সেবাময় সহজলভ্য, কারন এদেশে দরিদ্র জনসংখ্যাই বেশি। কিন্তু দেখাযাচ্ছে দরিদ্র মানুষ গুলো অসুস্থ হলে ক্লিনিক বা হাসপাতাল গুলোতে যাওয়ার কথা ভাবলেই তাদের পিলে চমকে যায় এই বুঝি গেলো শেষ সম্বলটুকু। ঠিক পুলিশকে যেমন ভয়পায় একজন অপরাধী। হ্যা তারাওতো অপোরাধী কারন তারা দরিদ্র, সামর্থ নাই এই উচ্চ চাহিদা সম্পূর্ন হাসপাতাল আর এই ডাক্তার সাহেবদের চাহিদা মেটানোর, তাই যত ভয় । আবার জীবনেরও ভয় অপারেশনটা না হলে মৃত্যুই হয়তবা অবধারিত ডাক্তার বাবুই বলেছেন অপারেশনের কথা, সাতপাঁচ ভেবে অবশেষে  দারিদ্রতাকে গোপন করেই ডাক্তার বাবুদের স্বরনাপন্ন হয়, আগে জীবনটা বাচুঁক অপারেশনটা হোক পরে দেখা যাবে, কিন্তু পরের গল্পটা হয় ভিন্ন যে গল্পে একজন সেবক তার মানবতাকে বিসর্জন দিয়ে হয়ে উঠেন একজন সার্থবাদি ব্যাবসায়ী এবং রাগে ক্ষোভে কখনো বা অমানুষের রুপ ধারন করেন।

এরকম অবস্থার মাঝেও অনেক সমায় সমাজে রচিত হয় নতুন গল্পের যা সমাজের মানুষকে দেখায় একটু আশার আলো, হয়ে উঠে উদাহারন, অথবা ভালো কিছু করতে ইচ্ছুক মানুষগুলোর অনুপ্রেরনা। এরকমই একটি গল্পের রচনা করলেন ন্যাশন্যাল ইনিস্টিটিউট অব নিউরো সাইন্স এর নিউরোসারর্জারি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডাঃমোঃ মাহফুজুর রহমান। গল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালের প্রথম প্রহরে ইসলামি ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল কাকরাইলে, এক দরিদ্র বাবার সন্তানের ব্রেইন টিউমার অপারেশনের মধ্য দিয়ে।

অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষমান হাফেজে কুরআন বালকটির স্বজনরা। বাবা মায়ের চোখে পানি এক বুক শঙ্কা এবং আশা নিয়ে প্রিয় সন্তানের গুরুতর অপারেশনটি সফল হবার জন্য মালিকের স্বরনে মগ্ন। এরই মধ্যে সার্জন ডাঃ মাহফুজুর রহমান ওটির দরজা খুলে বের হলেন।

রাত ১২.১০ মি.। ডাক্তার বেরিয়ে হাসিমুখে বললেন, আপনাদের রোগীর অপারেশন সাকসেস। অপারেশন সফল হবার খবর শুনেও যেন পুরো মাত্রায় খুশি হতে পারছেন না ছেলেটির বাবা-মা। অপারেশনের বিল ৬০০০০ টাকা। খুব বড় অংক না হলেও বালকটির পরিবারের জন্য এটা অনেক বড়। বাবা একজন মসজিদের ইমাম, কতইবা সঞ্চয় তার। সর্বসাকুল্যেও জোগাড় করতে পারেননি এই অংকের পুরোটা। যদ্দুর পেরেছেন তা নিয়েই প্রিয় পুত্রের অপারেশনের জন্য চলে এসেছেন হসপিটালে। কিন্তু ডাক্তার কি আর ওসব কথা শোনবে? এই ভেবে খুশিটা যেনো কোথায় হারিয়ে গেছে। আমাদের দেশের ডাক্তারদের চরিত্র কে না জানে?

সার্জন ডাঃ মাহফুজুর রহমান বালকটির বাবাকে ডেকে বললেন, অপারেশন তো হয়ে গেছে, এখন আপনারা বিলটা পরিশোধ করেন। আর মনে রাখবেন, আমরা মাত্র ৬০০০০ টাকায় করে দিলাম কিন্তু এই অপারেশন অন্য কোথাও করালে লক্ষ টাকার কমে করাতে পারতেন না।
এই বিলটা থেকেই কিছু কমাবার অনুরোধ করবার ইচ্ছা করছিলেন ছেলেটির বাবা কিন্তু ডাক্তারের কথা শুনে সেই সাহসটাও হারিয়ে ফেলেছেন। তবুও অনেক সাহস নিয়ে বললেন, স্যার, আমি গরীব মানুষ। আমার বুকের ধন ভয়াবহ টিউমারে আক্রান্ত হয়ে আমার চোখের সামনেই শেষ হয়ে যাবে। এটা তো আমার জন্য সহ্য করা সহজ হবে না। তাই যতটুকু জোগাড় করতে পেরেছি তা নিয়েই চলে এসেছি আপনার কাছে। স্যার, ৬০০০০ টাকা আমি কই পাবো। আমাকে কিছুটা রেহাই দেন । ডাঃ মাহফুজুর রহমান সব শুনলেন। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন তার অক্ষমতা এবং কলিজার টুকরো সন্তানের জন্য মায়ার বিপুলতা। রাত ১২ টা পেরিয়ে গেছে তখন। এই মধ্য রাতে অপারেশন করবার পর এসব গল্প শোনবার টাইম আছে নাকি। বের করেন টাকা, রাখেন এসব বকওয়াস, এমনই হুংকার দেবার কথা ছিলো কসাই ডাক্তার হিসেবে। কিন্তু যার মাঝে মানবতা আছে সেকি আর রাত কত হয়েছে তা ভাবে? তার কাছে তো মানবতা আগে।

তিনি কিছুই বললেন না, তিনি জানতে চাইলেন আপনার ছেলে হাফেজে কুরআন? জ্বী, স্যার! কোথায় পড়েছে ও? জামেয়া ইসলামিয়া ফজলুল উলুম মাদ্রাসায়।
ডাক্তার আর ছেলের বাবার এই কথোপকথন শুনে এগিয়ে এলেন অদূরেই দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার ওস্তাদ। বললেন, জ্বী, স্যার! ও আমার কাছেই হাফেজ হয়েছে। ভালো ইয়াদ আছে। আসন্ন বোর্ড পরিক্ষায় ওকে নিয়ে আমাদের স্বপ্নও আছে।

ডাক্তার  বললেন, ধন্য আপনারা! এমন সন্তান আমাদের দেশের গৌরব! এই বলেই তিনি ছেলেটার বাবার হাত ধরে বললেন, আসুন।

ছেলেটার শিয়রে এসে ডাক্তার বললেন, বাবা, কেমন বোধ করছ এখন? স্যার, মোটামুটি। ভয় করোনা দ্রুতই সেরে ওঠবে ইনশাআল্লাহ। ডাঃ মাহফুজুর রহমান বললেন, আব্বু, তুমি কি কুরআনের হাফেজ? সমগ্র কুরআন তুমি মুখস্থ করেছ? জ্বী, স্যার!আচ্ছা, একজন হাফেজে কুরআন কতজন মানুষকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিতে পারবে, জানো তুমি? জ্বী স্যার, অন্তত ১০ জনকে নিতে পারবে। আব্বু, তুমি কি আমাকে ওয়াদা দিতে পারো যে, যদি তুমি সেদিন এই বিশেষ ক্ষমতা লাভ করো, তাহলে আমার জন্যও সুপারিশ করবে? ছেলেটা একটু দম নিয়ে বললো, জ্বী স্যার, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আমাকে এই সুযোগ দিলে আপনার জন্য আমি সুপারিশ করবো। ডাঃ মাহফুজুর রহমানের চোখের কোনে চিকচিক করে ওঠলো রূপালী আলো।

তিনি কিছুক্ষণ থমকে থেকে বললেন, আব্বু আমি পবিত্র কুরআনের বিনিময়ে তোমার অপারেশন করে দিলাম। তোমার আব্বুকে এক টাকাও বিল পরিশোধ করতে হবেনা, আমি রোজ হাশরে কুরআনের হাফেজের সুপারিশ চাই। ছেলেটার বাবা চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। সদ্য অপারেশন হওয়া হাফেজে কুরআন বালকটাও কেঁদে ফেললো। অপারেশনের যন্ত্রণায় নয় বরং আবেগের তাড়নায়। সহযোগী সার্জন, নার্স সবাই বিস্ময় নিয়ে দেখছিলো, কী হচ্ছে এসব!? এরপর ডাঃ সাহেব সদ্য অপারেশন হওয়া হাফেজে কুরআন বালকটিকে  রিকোয়েস্ট করলেন একটু কুরআন তিলাওয়াত করতে। হৃদয়স্পর্শী সেই তিলাওয়াত মোবাইলে ধারণ করলেন তিনি স্মৃতি করে রাখলেন রাতটিকে। আর রচনা করলেন অমানবিক সমাজে একটি মানবতার গল্পের।